জুয়েল সাদত ১৬ আগস্ট ২০২১, ১৬:৫০
পুরো আগষ্ট মাসে বাতাস ভারী থাকে। শোকের মাতন। জাতির জনকের জন্য, মন প্রাণ কাঁদে। ইতিহাসে অনেক দেশের রাষ্ট্র্র নায়ক বা বিশেষ ব্যাক্তিরা আততায়ির হাতে মারা গেছেন। যেমন- জন এফ কেনেডি, বেনজির ভুট্রো, ইন্দিরা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং, তালিকা অনেক দীর্ঘ। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান যে ভাবে সপরিবারে মারা গেছেন তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। তার আত্বত্যাগ আমরা সারা জীবন মনে রাখব। এই ১৫ আগস্ট তার চলে যাবার ৪৬ তম বছর। উনার সাথে পরিবারে বাকী ১৬ জনের কি অপরাধ ছিল, তা আমরা কেউ ভাবি না। তিনি রাজনীতি করতেন শত্রু থাকতেই পারে, অনেককেই খুশি করা যায় না। তবে যিনি ৫৫ বছর এর জীবিত অবস্থায় কম বেশী জেলেই কাটালেন ১৪ বছর। উনার মত একজন দেশপ্রেমিক বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।
আজ অনেকেই নানা তেলবাজি করে জনকের জন্য মায়াকান্না করছেন। অথচ এই সব অতি উ্যসাহী রাইটার দের আমরা আগে দেখেনি। তারা কখনও ইনডেমনিটি বাতিল নিয়ে লিখেননি, আমরা ৯১ সাল থেকেই এই নিয়ে লিখেছি৷ আজ বঙ্গবন্ধু প্রেমীদের অতিরঞ্জিত কাজ দেখলে হাসি পায়। সবগুলো দেশি বিদেশী বাংলা কাগজে উনাকে নিয়ে নানান কিচ্ছা কাহিনী লেখা হচ্ছে। তেলবাজরা তাদের পথেই হাটছে। আমরা যারা জাতির পিতাকে ভালবাসতাম আজও বাসি। ৯১ /৯২ সালের পরে থেকেই লিখে যাচ্ছি। গত বছর জাতির জনকের জন্ম শতবার্ষিকী পালিত হল সীমিত আকারে, এবছর উনার ৪৬ তম প্রয়ান দিবস আমরা পালন করছি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে। অনেক বড় আকারে জন্ম শতবার্ষিকী পালনের অনুষ্ঠানগুলো করোনার কারনে সফলতা পেল না। বিশ্বব্যাপী মারনব্যাধী করোনা বিশ্বকে পাল্টে দিয়েছে। জাতির জনকের প্রিয় দল ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ অনেক দৃষ্টান্তমুলক কাজ করে বঙ্গবন্ধুকে সবার হৃদয়ে স্থান দিতে সচেষ্ট ছিল। বিশ্বের কোথাও গৃহহীনদের ফ্রি বাড়ি দেবার নজির নাই সেটাই করে দেখিয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। যদিও সেই বাড়ি ঘর তৈরীতে কিছুটা নিম্ন মানের কাজের কারনে তাও বিতর্ক তৈরী করেছিল।
শেখ মুজিব আমাদের বাংলাদেশর স্বপ্নদস্টা, আমাদের আবেগের জায়গা। বেগম ফজিলুতুন্নেছা ( মিসেস শেখ মুজিব) সহ আরো যে ১৫ জন মুন্মন্ত অবস্থায় মারা গেছেন, যদিও তাদেরকে মেরে ফেলা হয়েছে, তাদের জন্য দোয়া। মহান আল্লাহ তাদের সম্মানিত করবেন।
মুজিব বর্ষে অনেক কিছু করার সুযোগ ছিল। দেশে বিদেশে তা পালন হবে নানান ভাবে র্যালী, আলোচনা সভা, চিত্রাংকন ও নানান প্রকাশনার মাধ্যমে। কিন্তু তার চেয়ে বেশী করার মাধ্যম গুলো করতে পারত দুতাবাস গুলো। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে দেড় শত এর মত দুতাবাস ছিল আছে আরও বাড়ছে, তারা জাতির পিতাকে বহি:বিশ্বে বহুজাতির কাছে মুলধারায় উপস্থাপন করতে পারত। বিভিন্ন ভাষায় জাতির জনকের জীবনি প্রকাশ করে বুক আকারে। পৃথিবীর অনেকেই জানে না জাতির জনক শেখ মুজিব ১৯২০ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত মাত্র ৫৫ বছর বেচেছিলেন তাও আবার তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। তিনি ৩৫৭৯ দিন জেল জীবন কাটিয়েছেন যা বিশ্বের জনপ্রিয় নেলসন মেন্ডেলার সমকক্ষ। মাত্র ৪৫ বছর তিনি আলো বাতাসে ছিলেন। তাকে সপরিবারে মেরে ফেলা হয়েছে। পৃথিবীতে দ্বিতীয় ব্যাক্তি কেউ নেই যার এই বর্নাট্য করুন জীবনি। অথচ আমরা যারা আওয়ামী মনোভাবের বা বাংলাদেশী তারা তার কথা জানি প্রতিবছর বলেও বেড়াচিছ। কিন্তু বিশ্ব ইতিহাসে তার অবদান সামগ্রিক প্রচার কে করবে। তিনি বিশ্বের একজন আইডল নেতা হবার সুযোগ ছিল। মহাত্বাগান্ধিকে যদি বিশ্ব জানতে পারে, নেলসন মেন্ডেলাকে যদি বিশ্ব জানতে পারে তাহলে শেখ মুজিব কে কেন জানবে না বিশ্ব ? এই কাজটা কে করবে।
কেন বিশ্বের বিভিন্ন লাইব্রেরীতে জাতিন জনকের উপর কোন বই থাকবে না। কেন তার জীবনি ছোট বড় আকারে বিশ্বের নামি দামি প্রকাশনি কেন তৈরী করবে না। আমাদের তো টাকার কোন অভাব নেই। আমাদের সরকারের উচিত বিশ্বের নামি দামি লেখকদের দিয়ে তার জীবনি প্রকাশ করা- বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায়। শত শত কোটি টাকা খরচ করে জন্ম শত বার্ষিকী আমরা পালন করেছি, দেশের সেরা সেরা লেখকরা গল্প কবিতা গান রচনা করছেন। কিন্তু তাতো সবই ঢাকা কেন্দ্রিক তোষামোদর জন্য। ইংরেজীতে কি করতে পারছি, কেন আমরা ফরাসি ভাষায়, স্পেনিশ ভাষায়, হিন্দি ভাষায়, চায়নিজ ভাষায়, আরবি ভাষায় তার জীবনি নিজেদের খরচে প্রকাশ করছি না। কাজের কাজ তো সেটাই। সারা বিশ্বে জন্ম শত বার্ষিকী পালিত হল, কিন্তু বিশ্বের নতুন প্রজন্মকে আমরা কিভাবে তাকে চেনাব। আমরা যদি বাংলাদেশে থেকে নেলসন মেন্ডেলাকে চিনি, আমাদের বাচ্চারা যদি নেলসন মেন্ডেলাকে চিনে, আমাদের বাচ্চারা যদি মার্টিন লুথার কিং (সাদা কালোর মুভমেন্টের আইকন ) কে চিনে তাহলে আমেরিকান নতুন প্রজন্ম কেন জাতির জনককে চিনবে না। আমাদের আইকনিক নেতা জাতির জনককে তাদের কারও চেয়ে কম নন। তিনি অনেক উর্ধ্বে, তিনি তার জীবন উ্যসর্গ করেছেন মানুষের মুক্তির জন্য। আমাদের উচিত বিশ্বের সেরা সেরা লাইব্রেরীতে শেখ মুজিবের উপর বই প্রেরন করা। তা কিভাবে সম্ভব তা খুজে বের করতে হবে। বিশ্বের সেরা সেরা প্রকাশনিকে বলতে হবে তারা যেন তা প্রকাশ করে। তাহলেই তাকে বিশ্বের আইকন হিসাবে পরিগনিত করা যাবে।
বিশ্বের শত শত দেশে আমাদের দুতাবাস রয়েছে, তাদের উচিত তাদের মাধ্যমে সে দেশের মুলধারায় জাতির জনকের জীবনি বিভিন্ন স্কুল কলেজের লাইব্রেরীতে স্পন্সর শিপের মাধ্যমে তা প্রকাশ করে বিতরন করা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আমাদের অনেক আইকনিক ব্যবসায়ীরা রয়েছেন দুতাবাস তাদের বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকে, দুতাবাসের কর্মকর্তারা তাদের সাথে যৌথভাবে ইংরেজী বই প্রকাশ করে বা সে দেশের ভাষায় জাতির জনকের জীবনি ছোট আকারে বা বড় আকারে প্রকাশের উদ্যোগ নিতে পারে। ব্যাবয়ায়ীদের অনুরোধ করা যায় শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতাবার্ষিকী পরেও যেন তারা স্পন্সর করে তার জীবনী প্রকাশ করে দেশে ও বহি:বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়। অনেক ভাল কাজ করার সুযোগ রযেছে। আসলে বিদেশী কোন গবেষক যদি সঠিক ভাবে জানতে পারে কে ছিলেন শেখ মুজিব, কি ছিল তার জীবনের লক্ষ্য, কেমন ছিল তার ব্যবহার, তিনি কেমন কাটিয়েছেন তার ৫৫ বছর, কতটা সফল নায়ক ছিলেন তাহলে তারাই লিখতে বা গবেষনা করতে শুরু করবে। তার জীবনি নিয়ে পিএইচডি হবে। আসলে আমরা বাংলাদেশের মধ্যই উনাকে আটকে রেখেছি। তার সঠিক বিশ্ব মুল্যায়ন হয়নি, হচেছও না। যে শত শত মিলিয়ন ডলার খরচ করে তার জন্মশতবার্ষিকীর্কীর বাজেট আমরা করেছিলাম, যদিও তা করা হয়নি। এই বাজেটের একটি অংশ দিয়ে যদি আমরা তাকে ব্রান্ডিং করতে পারতাম। জন্ম শতর্বার্ষিকী জন্য তার জন্য গান রচনা হয়েছে, কনসার্ট হবার কথা ছিল, শত শত সুভেনির, বই, গল্প, উপন্যাস রচিত হবার পথে ছিল। কিন্তু তার পরিধি সব কিছুই দেশেই সীমাবদ্ব। আমরা তাকে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের মধ্য রেখে দিয়েছি। কিন্তু আমাদের বিভিন্ন ভাষার পাবলিকেশন না হলে তাকে আমারা বাংলা ভাষার দুটো দেশের কিছু মানুষের কাছেই রেখে দিলাম। আমাদের বিশ্ব দরবারে তাকে তুলে ধরতে হবে।
অসাধারন এক অনন্য মানব শেখ মুজিব। অসাধারন ছিল তার চিন্তা। লোভ লালসাহীন, এক প্রানবন্ত হ্যামিলনের বাশিওয়ালা। সাত কোটি মানুষের স্বপ্ন পুরুষ ছিলেন। তাকে নিয়ে গবেষনার বিস্তর মাধ্যম পড়ে আছে। আমরা তাকে নিয়ে অহেতুক বাড়াবাড়ি করে তাকে ক্ষুদ্রতায় আবদ্ব করেছি। তার অনন্য পোষাকটাও আজ অবমুল্যায়ন হচেছ। তিনি তার একটি পোষাককে তার নামে সমাদ্রিত করতে পেরেছেন। মুজিব কোট বলতে একটি বিশেষ পোষাক কে বোঝায়। এ নিয়েও গবেষনার সুযোগ আছে। এক শত বছর আগে তিনি জন্মেছিলেন মাত্র ৫৫ বছরের বর্নাট্য জীবন কজনের আছে। তার উদাসিনতার জন্য তার আত্ব বিশ্বাসের জন্য তার সাথে আরও সতের জন প্রান হারান। পৃথিবীতে কোন গোষ্টিকে এমন ভাবে মেরে ফেলার ইতিহাস নেই। কালের আবর্তে আজ তার মৃত্যু শক্তিতে রুপান্তরিত হয়েছে। সব মানুষকে মৃত্যু বরন করতে হয়, তার এই আত্ব ত্যাগ তাকে আল্লাহ এক অনন্য মর্যাদার আসনে বসাবেন এই প্রত্যাশা কোটি কোটি মুক্তিকামি বাংলাদেশীদের। আমরা এই ক্ষনজন্মা বিরপুরুষের বিদেহী আত্বার শান্তি কামনা করি। আর সবার কাছে অনুরোধ যে যেভাবে পারেন তার জীবনি দেশে বিদেশে নানান ভাষায় প্রকাশ করুন। বাংলাদেশের ইংরেজী মাধ্যমের স্কুল গুলোতেও তার জীবনি প্রকাশ জরুরী পার্ঠ্যসুচিতে। আর আমরা যারা লেখক সংগঠক মুজিব আদর্শের আছি তাকে ভালবাসি তার জীবনি প্রকাশে ও ছড়িয়ে দিতে সর্বাত্বক নিবেদিত হই নানান ভাষায়। নানান মাধ্যমে তাকে নেলসন মেন্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং এর সম পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। জাতির জনক তাদের চেয়ে ও উর্ধে। আমাদের উদাসীনতায় তিনি ক্ষুদ্র একটি গোষ্টির মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছেন। আবুদাবীর জাতির জনক শেখ জায়েদ, তার সমাধিস্থলে দিন রাত কোরআন তেলাওয়াত হচ্ছে। সেই শেখ জায়েদের নামে তার কবর স্থানের পাশে একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ প্রতিষ্টিত। যা দেখতে বিশ্বের মানুষ ভিড় করেন। আমরাও সেরকম শেখ মুজিবের কবরস্থানে দিন রাত তেলাওয়াতের ব্যবস্থা করতে পারি।
জন এফ কেনেডির নামে যদি আমেরিকার জনপ্রিয় বিমান বন্দর হতে পারে তাহলে আমরা কেন জাতির জনকের সম্মানার্থে একটি বিমান বন্দর করতে পারলাম না। আমাদের নিজের ব্যার্থতার কারনেই তিনি দেশে ও বিদেশে অনাদৃত।
জুয়েল সাদত :
সাংবাদিক -কলামিষ্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক। আমেরিকা
প্রধান সম্পাদকঃ মোহাম্মদ আবুল বশির
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মনির হোসেন
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়ঃ ৩৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫
মোবাইলঃ +৮৮ ০১৮১৩ - ৮১৮৬৯৬
ফোনঃ +৮৮ ০২ - ৫৫০১৩৯৩৯
ইমেইলঃ shwapnerbd@gmail.com