সামুদ্রিক কাছিম: পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা

আজকের লেখার শুরুতেই মনে পড়ছে কবি রফিক আজাদের প্রতীক্ষা শিরোনামের একটি কবিতার কথা। কবিতায় কবি অপেক্ষা এবং প্রতীক্ষা শব্দ দুটির মধ্যে একটি পার্থক্য টেনেছেন। যদিও কবির উক্তিতেই রয়েছে যে অভিধানে শব্দ দুটির তেমন কোন পার্থক্য নেই। ঠিক আজকের লেখাটিতে ও এমন একটি বিভ্রান্তিকর বিষয় রয়েছে। বাংলা কিংবা ইংরেজি অভিধানের প্রায় সবগুলোতেই টারটেল এবং টরটয়েচ শব্দ দুটির তেমন কোন পার্থক্য নেই। শব্দ দুটি একে অপরের প্রতিশব্দ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু যারা প্রাণিবিদ্যার ছাত্র-ছাত্রী কিংবা প্রাণী জগৎ নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে, তারা বিষয়টি জানেন যে শব্দ দুটির মধ্যে পার্থক্য অনেক। প্রকৃতপক্ষে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি প্রাণীর ইংরেজি নামবাচক শব্দ। তবে বাংলা ভাষায় প্রাণী দুটির খুব সুন্দর নাম আছে। আবার পার্থক্যটাও খুব সুন্দরভাবে প্রতিষ্ঠিত। সাধারণত টারটেলকে কাছিম এবং টরটয়েচকে কচ্ছপ বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। আজকের লেখায়ও ঠিক এভাবেই বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে।
এখন একটি প্রশ্ন মনে আসছে। তার আগে একটি স্মৃতিময় ঘটনা একটু বলে নিই। ঘটনাটি ২০০৭ সালের। আমার স্পষ্টতই মনে আছে, উচ্চশিক্ষার তৃতীয় বর্ষে মার্চ মাসের শেষের দিকে আমরা শিক্ষা সফরে গিয়েছিলাম। সেই সফরে আমরা রাঙ্গামাটি, কক্সবাজার এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপে অবস্থান করেছিলাম। সেন্টমার্টিন দ্বীপে অবস্থানকালীন খুব ভোরে যখন হাঁটতে বের হয়েছিলাম, তখন দ্বীপের সৈকতের বালিয়াড়িতে একটি মৃত প্রাণী পড়ে থাকতে দেখে আমি তৎক্ষণাৎ ফিরে এসে আমার শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক প্রফেসর ড. মো. নজরুল ইসলাম (বর্তমানে ডিন- ফ্যাকাল্টি অফ বায়োলজিক্যাল সাইন্স, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়) স্যারকে বলেছিলাম, ‘স্যার আমি বিচে একটি বড় আকারের কচ্ছপ মৃত অবস্থায় দেখেছি’। স্যার সঙ্গে সঙ্গে একটু মৃদু হাসলেন এবং আমাকে বললেন যে সম্ভবত তুমি যা দেখেছ তা বড় কচ্ছপ নয়। তা কচ্ছপের মতো দেখতে একটি ভিন্ন প্রাণী-সামুদ্রিক কাছিম। পরবর্তীকালে স্যার অবশ্য আমার সঙ্গে সৈকতে গিয়ে ওই মৃত সামুদ্রিক কাছিমসহ অন্যান্য প্রজাতির কাছিম সম্পর্কে বিশদ ধারণা দিয়েছিলেন। এটাই হলো আমার প্রথম সামুদ্রিক কাছিম দেখার ঘটনা, যদিও তা ছিল মৃত। এরপর থেকে আমি প্রায়ই আমার কাছের মানুষগুলোকে প্রশ্ন করতাম যে তারা কাছিম দেখেছে কি না। লেখার শুরুতেই আমি সকল পাঠককে এই প্রশ্নটিই করতে চেয়েছিলাম। আমার বিশ্বাস এই প্রশ্নের উত্তরে অধিকাংশ মানুষই না সূচক জবাব দিবে। অথচ সামুদ্রিক কাছিম সম্পর্কে আমাদের সকলকেই বিশদভাবে জানা একান্ত প্রয়োজন।
কিন্তু বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। ভিন্ন এ কারণে বলছি যে, আমরা অধিকাংশই এখনো পর্যন্ত কাছিম এবং কচ্ছপ এর মধ্যকার পার্থক্যই হয়ত জানি না। এমনকি উচ্চ শিক্ষিত অনেকেই কাছিম এবং কচ্ছপকে একই প্রাণী প্রজাতি হিসেবে মনে করে থাকেন। আর যারা কাছিম এবং কচ্ছপ দুটোই স্বচোখে দেখেছেন তাদের ধারণা এমন যে, দেখতে আকারে অপেক্ষাকৃত বড় প্রাণীটিকে কাছিম এবং ছোট প্রাণীটিকে কচ্ছপ বলে। এ বিষয়টি আমি নিবন্ধের শুরুতে কিছুটা স্পষ্ট করেছি। প্রকৃতপক্ষে কাছিম এবং কচ্ছপ আলাদাভাবে ভিন্ন দুটি প্রাণী প্রজাতি। কাছিম পানিতে (সাধারণত সমুদ্রে) বাস করে এবং সাঁতার কাটতে পারে। পক্ষান্তরে কচ্ছপ স্থলে বাস করে। সাধারণত কচ্ছপের তুলনায় কাছিম আকৃতিতে অনেক বড় হয়ে থাকে। এছাড়াও অন্যান্য আরো কিছু বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য রয়েছে।
পৃথিবীর চার ভাগের প্রায় তিন ভাগ অংশে পানি থাকায় পৃথিবীটাকে আমার সব সময় একটি পানিতে নিমজ্জিত গ্রহ বলে মনে হয়। জলমগ্ন সামুদ্রিক এই প্রতিবেশে যে কয়েকটি প্রাণী দীর্ঘকাল ধরে টিকে আছে সামুদ্রিক কাছিম তাদের অন্যতম। মনে করা হয়ে থাকে ডাইনোসরেরা প্রায় ১১০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে ঘোরাঘুরি করার আগেও সামুদ্রিক কাছিমগুলো বিশ্বের মহাসাগরগুলোতে সাঁতার কাটছিল। অথচ এই গ্রহের সব দিক থেকে প্রকট বৈশিষ্ট্যের যে মানব প্রজাতি তাদেরকে খুব কম দেখেছে এবং জেনেছে কিংবা সামুদ্রিক যে প্রতিবেশ ব্যবস্থায় তারা এত দীর্ঘকাল টিকে আছে, আজকে তারা সেখানেই সেই মানব প্রজাতির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণেই বিপন্ন কিংবা বিলুপ্তির পথে মর্মে নিশ্চিতভাবেই বলা হচ্ছে।
বাংলাদেশের চিত্র বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় মোটেও ভিন্ন নয়। বরং সব দিক বিবেচনায় একটু বেশি ক্রিটিক্যাল। বাংলাদেশের উপকূল এবং তৎসংলগ্ন দ্বীপগুলোতে বেশ কয়েকটি প্রজাতির সামুদ্রিক কাছিম দেখা যায় মর্মে বিভিন্ন গবেষণাপত্রে সময়ে সময়ে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের উপকূলের সবটুকুই সামুদ্রিক কাছিমের জন্য উপযুক্ত নয়। উপকূলের যে অংশে কাছিমের বাসা বাঁধার উপযুক্ত পরিবেশ অর্থাৎ বালুকাময় সৈকত রয়েছে, সে সমস্ত জায়গায় তাদেরকে বাসা বাঁধতে দেখা যায়। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের উপকূলীয় অঞ্চল অর্থাৎ চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার ও এর বিভিন্ন দ্বীপের যেখানে নিরবিচ্ছিন্ন সৈকত হয়েছে, সেখানে এসকল সামুদ্রিক কাছিমের তুলনামূলক কিছুটা প্রাচুর্য রয়েছে। তবে বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলেও এ ধরনের সামুদ্রিক কাছিম দেখা যায় মর্মে জানতে পেরেছি। সামুদ্রিক কাসিম সম্পর্কিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় গবেষণা থেকে জানা যায় যে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ১৯৮০ সালের পর থেকে সামুদ্রিক কাছিমের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমতে শুরু করে।
বর্তমানে সাত প্রজাতির সামুদ্রিক কাছিম সমুদ্রে ঘুরে বেড়ালেও বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানায় এ পর্যন্ত পাঁচ প্রজাতির সামুদ্রিক কাছিমের রেকর্ড হয়েছে মর্মে বিভিন্ন গবেষণায় রিপোর্ট করা হয়েছে। এগুলো হলো গ্রিন টারটেল, লগারহেড টারটেল, অলিভ রিডলে টারটেল, হক্সবিল টারটেল এবং লেদারব্যাক টারটেল। এই ৫টি প্রজাতির মধ্য অলিভ রিডলে টারটেল এবং গ্রিন টারটেল সচরাচর দেখা গেলেও হক্সবিল প্রজাতিটি খুব কমই দেখা যায়। একটি অসমর্থিত সূত্র অনুযায়ী জানা যায় যে, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় লগারহেড প্রজাতিটি এক সময় ছিল। তবে বর্তমানে বেশ অনেকদিন ধরেই আর দেখা যায় না। লেদারব্যাক প্রজাতিটি বাংলাদেশ রিপোর্ট হলেও বাসা বাঁধার কোন নজির নেই।
সামুদ্রিক কাছিম সারাবিশ্বে বিপন্ন এবং তারা ভূমি থেকে সমুদ্র উভয় জায়গাতেই বিলুপ্তির সম্মুখীন হচ্ছে। যদিও তারা উপকূলবর্তী সমুদ্রে বসবাস করে তবুও তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে নিশ্চিত করতে সমুদ্র তীরবর্তী বালিয়াড়িতে আসতে হয়। সামুদ্রিক কাছিমের সকল প্রজাতিগুলো পৃথিবীর অন্যান্য অংশের মত বাংলাদেশেও টিকে থাকার লড়াই এ খুব কঠিন সময় পার করছে। বিভিন্ন সময়ে আমি সরেজমিন কক্সবাজার ও এর বিভিন্ন দ্বীপগুলো, বিশেষ করে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ কয়েকবার পরিদর্শন করে বাংলাদেশে সামুদ্রিক কাছিম আশঙ্কাজনক হারে কমার বেশ কয়েকটি কারণ খুজে পেয়েছি যা এখানে বলতে চাই। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারি, ২০২০ মাসে আমি কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিনে যাই।
বিভিন্ন কারণে সামুদ্রিক কাছিমের ডিম ধ্বংস হয়ে যাওয়া এবং সমুদ্রে মাছ ধরার সময় পরিণত ও বংশবৃদ্ধির উপযোগী কাছিমগুলো আহত হওয়া কিংবা মারা যাওয়ায় বাংলাদেশসহ বিশ্বে সামুদ্রিক কাছিমের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। অন্যান্য যে সকল কারণে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানায় সামুদ্রিক কাছিমের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে তার মধ্য গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো নিম্মে উল্লেখ করলাম-
** বাণিজ্যিক মাছ ধরার কার্যক্রমের সময় জেলেদের ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রকারের অসংখ্য জালের সঙ্গে সামুদ্রিক কাছিম আটকে মারা যায়। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনার খুবই কমসংখ্যক আমরা বিভিন্ন সময় সংবাদপত্র দেখেছি। সামুদ্রিক কাছিমের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর হিসেবে এই প্রকারের মাছ ধরার যন্ত্রপাতিকে মনে করা হয়ে থাকে। তাছাড়া জেলেদের পরিত্যক্ত সুতার জাল এবং প্লাস্টিকের ও নাইলোনের রশিতে পেচিয়ে অনেক সামুদ্রিক কাছিম মারা যায়।
**সামুদ্রিক কাছিমগুলো যখন সৈকতে ডিম পাড়ার জন্য আসে, তখন তাদের নিরব ও নিস্তব্ধ পরিবেশের প্রয়োজন হয়। সৈকতে অতিরিক্ত পর্যটকদের ভিড় এবং তাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন শব্দ যন্ত্রের দ্বারা সামুদ্রিক কাছিমগুলো উৎপীড়নের এবং যন্ত্রণার শিকার হয়। এতে তাদের জীবনচক্র ব্যাহত হয়।
**মানুষের বিভিন্ন রকম পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পরিচালিত ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে সামুদ্রিক কাছিমের বাসস্থান ধ্বংস হওয়ার ফলে প্রকৃতিতে অবধারিতভাবে সামুদ্রিক কাছিমের সংখ্যা কমছে। বিশেষ করে সৈকতের পাশ দিয়ে অনেক বহুতল ভবন বিশেষ করে হোটেল, মোটেল ও কটেজ তৈরি করা হয়েছে এবং জিও ব্যাগ স্থাপন করে সৈকতের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা হয়েছে। এ সকল স্থানে এক সময় সামুদ্রিক কাছিম ডিম দিত। ফলে বাসস্থানের সংকট তৈরি হওয়ায় পূর্বের মতো এদেরকে আর দেখা যায় না।
**বর্তমানে সাগর সৈকতে সামুদ্রিক কাছিম এর অন্যতম শত্রু হিসেবে অসংখ্য কুকুর ও গুইসাপের বৃদ্ধি যথেষ্ঠ চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুকুর ও গুইসাপ ডিম পাড়তে আসা মা কাছিম কে আক্রমণ করে। এ সময় এরা ভীত হয়ে ডিম না দিয়ে সমুদ্রে ফিরে যায়। তাছাড়া ডিম ফোটার কয়েকদিন পূর্বের সময়ে যে গন্ধ বের হয় তা অনুসরণ করে এরা ডিম খেয়ে ফেলে। এতে করেও সামুদ্রিক কাছিমের সংখ্যা দিন দিন কমছে।
** জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় জোয়ারের সময় সৈকতের অধিক এলাকা প্লাবিত হয়। ফলে ডিম নষ্ট হয়ে যায় এবং কোন বাচ্চা তৈরি হয় না। সামুদ্রিক কাছিমের বিভিন্ন প্রজাতির সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে কমার এটি একটি অন্যতম কারণ। তাছাড়া বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সৈকতের বালিয়াড়িতে তাপমাত্রা বেড়ে যায়।সামুদ্রিক কাছিমের লিঙ্গ নির্ধারণে তাপমাত্রার প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকে। তাপমাত্রা বাড়লে অধিকাংশ বাচ্চা স্ত্রী লিঙ্গের এবং তাপমাত্রা কমলে বাচ্চা পুংলিঙ্গের হয়। বালিয়াড়ির তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে অধিকাংশ বাচ্চা স্ত্রী লিঙ্গের হয় যা পরবর্তী প্রজন্ম তৈরিতে অনেক বাধার সৃষ্টি করে।
**অবৈধভাবে সমুদ্র সৈকতে এবং সৈকত সংলগ্ন স্থানে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি এসকল জায়গায় বিভিন্ন বাণিজ্যিক দোকানপাট ও মনিহারি মার্কেট তৈরি করা হয়েছে। এসকল স্থাপনায় বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য বিভিন্ন ধরনের ছোট বড় জেনারেটর স্থাপন করা হয়েছে। রাতে এসকল জেনারেটর হতে উৎপন্ন বিকট শব্দ সৈকতে শব্দদূষণ করছে। এ সকল কার্যক্রমের দ্বারা সামুদ্রিক কাছিমের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। ফলে তারা ডিম দিতে সৈকতে আসতে অনুৎসাহিত হয়।
**সামুদ্রিক কাছিম যে সমস্ত জায়গায় ডিম পাড়ে সেখানে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক আলো তাদের স্বাভাবিক বিচারণকে বাধাগ্রস্ত করে। তাছাড়া রাতের বেলা ডিম পাড়ার সময় ফ্ল্যাশ লাইট ব্যবহার করে ছবি ধারনের চেষ্টা করা হলে তাদের ডিম পাড়ার প্রক্রিয়াটি বাধাপ্রাপ্ত হয়।
**সৈকতের দূষণ, ভাঙ্গন ও বিভিন্ন পরিবর্তন দ্বারা কাছিমের স্বাভাবিক চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে বালিয়াড়িতে বিভিন্ন প্রকারের প্লাস্টিক দ্রব্য ফেলার কারণে প্রতিনিয়ত সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। তাছাড়া ভাঙ্গনের কারণেও সৈকতের স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রতিবেশগত অবস্থা ধ্বংস হচ্ছে। এতে প্রত্যক্ষভাবে সামুদ্রিক কাছিমের প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
**সমুদ্র সৈকতে পর্যটকের অনিয়ন্ত্রিত সাইকেল ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন চালানো, ফুটবলসহ বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা করা এবং রাতের বেলায় ক্যাম্ফফায়ার, কনসার্ট, আতশবাজি ফোটানো এবং ফানুস উড়ানোর ফলে সামুদ্রিক কাছিম সৈকতে ডিম পাড়তে যে নিস্তব্ধ পরিবেশের প্রয়োজন হয় তা ব্যাহত হয়।
**তাছাড়া সৈকতে ঘুরতে আসা অসংখ্য পর্যটক এর অনিয়ন্ত্রিত বিচরণ ও আচরণ এবং অপরিণামদর্শী কার্যক্রম সৈকতের স্বাভাবিক পরিবেশকে বিঘ্নিত করে যা প্রত্যক্ষভাবে সামুদ্রিক কাছিমের প্রজনন প্রক্রিয়া ও স্বাভাবিক জীবন ধারাকে ব্যাহত করে। এটি বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্যের জন্য অন্যতম প্রধান সমস্যা।
তবে বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক কাছিম কমে যাওয়ার আরো কিছু কমন কারণ রয়েছে যা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। সেগুলো নিম্নরূপঃ
**বিভিন্ন কারণে সমুদ্রের পানি দূষিত হয়ে সমুদ্রের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হচ্ছে। বিশেষ করে সমুদ্রে বর্জ্য অপসারণ, পরিত্যক্ত প্লাস্টিক জাতীয় বিভিন্ন পদার্থ নিক্ষেপ এবং তেলবাহী বিভিন্ন জাহাজ ও নৌযানের দুর্ঘটনায় সমুদ্রের পানি দূষিত হয়। এ সকল কারণে সামুদ্রিক কাছিমের স্বাভাবিক চলাচল, খাদ্য গ্রহণ ও বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
**কাছিমের অবৈধ বাণিজ্য ও পাচারের কারণে বর্তমানে এর সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে মর্মে রেকর্ড হয়েছে। জাপান সামুদ্রিক কাছিম বিপণনের জন্য এক নম্বর স্থানে রয়েছে।তারা অনেকগুলো সামুদ্রিক কছিমের পণ্য তৈরি করে। জাপানের মত অনেক দেশের মানুষের অন্যতম প্রিয় খাদ্যও কাছিমের ডিম ও মাংস। তাছাড়া কাসিমের শেল (উপরের শক্ত খোলশ) ও ত্বক চামড়া শিল্পে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ ডিম, মাংস, চামড়া এবং খোলশের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক কাছিমগুলো ধরা হচ্ছে। ফলে ব্রীডিং উপযোগী কাছিমের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
**প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে সামুদ্রিক ঝড় এবং সমুদ্রে ভূমিকম্প জনিত কারণে সৃষ্ট সুনামির ফলে কাছিমের বাসা ধ্বংস হয়ে যায়। এ ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় বারবার উপকূলে আঘাত হানার কারণেও সামুদ্রিক কাছিমের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
**সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণ এবং সৈকতে মাইক্রো প্লাস্টিক দূষণ বিশ্বজুড়ে সমুদ্রে সামুদ্রিক কাছিম ধ্বংসের আরেকটি কারণ । প্লাস্টিকের সর্বশেষ গন্তব্য সমুদ্র। ফলে সমুদ্রের তলদেশে প্লাস্টিকের ধ্বংসাবশেষ দ্বারা সৃষ্ট হুমকি সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসকল প্লাস্টিকের ধ্বংসাবশেষ খেয়ে এবং তাতে জড়িয়ে সামুদ্রিক কাছিম গুলো মারা যাচ্ছে।
**সামুদ্রিক কাছিমের অভয়ারণ্য ও কাছিমসমৃদ্ধ বিভিন্ন সাগরে বাণিজ্যিকভাবে মৎস্য আহরণের সময় পরিত্যক্ত জাল এবং বিভিন্ন ফিশিং গেয়ার ও সুতা পানিতে ফেলা হয়। ফলে এসকল পরিত্যক্ত জাল এবং ফিশিং গিয়ারে কাছিমগুলো জড়িয়ে পড়ে এবং মারা যায়।
বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানায় প্রাপ্ত কাছিম প্রজাতিগুলো সুরক্ষার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের চেষ্টার যে কোন ত্রুটি নেই একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এক্ষেত্রে সরকারের পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে যে সকল প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ কারণে সামুদ্রিক কাছিমের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে তা উদঘাটন ও দূরীকরণে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপের জন্য সময়ে সময়ে বেশ কয়েকটি আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।শুধু সামুদ্রিক কাছিমই নয় বরং সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ও উন্নয়নে এ সকল আইন ও বিধিমালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক ক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগও আমরা লক্ষ্য করেছি। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বেসরকারি সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি এগিয়ে এসেছেন। জানা যায় যে, দেশের অনেক উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এ বিষয়ে গবেষণা পরিচালিত হয়েছে এবং বর্তমানেও হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে সামুদ্রিক কাছিম রক্ষায় ও বংশ বৃদ্ধির মাধ্যমে সংখ্যা বৃদ্ধি করণে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সামুদ্রিক কাছিমের সুরক্ষায়, এর সংখ্যা বৃদ্ধিতে এবং পৃথিবীতে ভালোভাবে টিকিয়ে রাখতে বিশ্বের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা ইউএনইপি এর উদ্যোগে ১৬ জুন বিশ্ব সামুদ্রিক কাছিম দিবস উদযাপন করা হয়ে থাকে। একটি দূষণমুক্ত স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ সমুদ্র এবং সমুদ্র সৈকত সামুদ্রিক কাছিম এর জন্য নিশ্চিত করাই হোক এবারের বিশ্ব সামুদ্রিক কাছিম দিবস ২০২০ মূল লক্ষ্য।
লেখক: পরিদর্শক, পরিবেশ অধিদফতর, গাজীপুর