আমার কাজের দ্বারা যেনো অন্যের ক্ষতি না হয়: মো. ফরিদ উদ্দিন

* পুলিশের পোশাক পরে কেউ যদি নিজেকে শক্তিশালী মনে করে তাহলেই তার সর্বনাশ
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে বরাবরই আন্তরিক
মনির হোসেন ও নূর মামুন
পুলিশ জনগণের বন্ধু। যেকোন সমস্যা বা তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে মানুষ ছুটে যান পুলিশ বিভাগের কাছে। জনগণের সেবা করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত জীবন কিংবা পরিবারকে দেয়ার খুব বেশি সময় থাকে না। তারপরও দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করে তারা গর্ববোধ করেন, আনন্দও পান। হোক না চ্যালেঞ্জের চাকরি, নানা কৌশল আর মেধা দিয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সাফল্যের চুঁড়ায় পৌঁছে যান। আর এমনি এক পুলিশ কর্মকর্তা হলেন মো. ফরিদ উদ্দিন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারি জোনের উপকমিশনারের দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। দায়িত্ব নেয়ার পর এ অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সাফল্যের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করছেন। দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অবদানের জন্য পেয়েছেন রাষ্ট্রপতি পদক (পিপিএম)।
সম্প্রতি স্বপ্নের বাংলাদেশকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তার ব্যক্তিজীবন, চাকরিজীবন, সাফল্যের কারণ, কর্ম পরিকল্পনা, পুলিশ অফিসার হিসেবে দায়িত্বের কথা, কাজের চ্যালেঞ্জসহ নানা বিষয়।
চাকরি নেয়ার শুরুর গল্পটা জানতে চাইলে ফরিদ উদ্দিন বলেন, ছাত্রজীবনে স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হব। ভর্তি পরীক্ষাও দিয়েছিলাম, কিন্তু সুযোগ হয়নি। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরেস্ট্রিতে ভর্তি হই। তখন নতুন স্বপ্ন দেখলাম, বিসিএস দিয়ে সরকারি কোনো চাকরি করবো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার সময় চাকরির বাজারের বৈশিষ্ট্য কিছুটা পরিবর্তন হল। বেসরকারিখাত এগিয়ে যাওয়ায় ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরির চাহিদা বাড়ল। বিশেষ করে ব্যাংকিং, মোবাইল ও প্রাইভেট এয়ারলাইনস সেক্টর তখন ভালো। ফলে, বন্ধু-বান্ধবদের অনেকেই সরকারি চাকরিতে না গিয়ে বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশ করল। এগুলো দেখে নিজের মনও প্রভাবিত হল। ইচ্ছে জাগলো ব্যাংকে চাকরি নিবো। ব্যাংকে চাকরি হয়। আইএফআইসি ব্যাংকে জয়েন করি। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আরো বেশ কয়েকটা ব্যাংকে চাকরির সুযোগ হয়। এরই মধ্যে ২৪তম বিসিএসের নিয়োগ কার্যক্রমে জটিলতা কেটে গেলে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে ২০০৫ এ পুলিশের এএসপি হিসেবে যোগদান করি।
তিনি বলেন, এ চাকরিতে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। আছে মানসিক চাপ। সেই সঙ্গে পরিশ্রম। তারপরও এখানে মানুষের জন্য কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। যদিও এখানে অন্যের খারাপ করার সুযোগও আছে। যেহেতু আমি সেবা হিসাবে এই পেশায় এসেছি, সবসময় চেষ্টা করি আমার দ্বারা যেন অন্যের ক্ষতি না হয়।
বলা হয় পুলিশ বাহিনীতে রাজনৈতিক দল, সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে নানা চাপ কিংবা তদবির আসে, সেগুলো কিভাবে সামলান এমন প্রশ্নে ফরিদ উদ্দিন বলেন, কৌশল আসলে সহজ। পুলিশের পোশাক পরে কেউ যদি নিজেকে শক্তিশালী মনে করে তাহলেই তার সর্বনাশ। এটি আমাদের দায়িত্ব। জনগণের সেবা করার যে সুযোগ আমরা পেয়েছি তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে। সে ক্ষেত্রে নিজের ভালো মনুষ্যত্বকে ধরে রাখতে হবে। পাশাপাশি নিজের টিমকে একই মূল্যবোধে চালাতে হবে। সেজন্য সুপারভাইজিং গুরুত্বপূর্ণ। সবাই ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছে কিনা তা মনিটর করা। এতে অবহেলা থাকলে ভালো সেবা দেয়া কখনই সম্ভব নয়। আর চাপ তো থাকতেই পারে, সৎ ও পেশা দারিত্বের সঙ্গে কাজ করলে কোনো চাপই সমস্যা নয়।
প্রবাসী কিংবা তাদের স্বজনদের কোনো সমস্যা সমাধানের অভিজ্ঞতা রয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রবাসীদের প্রচুর সমস্যা পেয়েছি। বিশেষ করে সিলেট পোষ্টিংয়ের সময়। সেখানে প্রবাসীদের সংখ্যা বেশি। তাদের সম্পত্তি দখলসহ নানা অভিযোগ শুনতে হত। এরকম যখন যা সামনে এসেছে, তখন তা আন্তরিকতার সঙ্গে করেছি। ঢাকায়ও লন্ডন প্রবাসী এক মহিলার জায়গা বেদখল হয়েছিল। অভিযোগ পাওয়া মাত্রই আমরা সে জায়গা উদ্ধার করে দিয়েছি।
পুলিশের সেবায় মানুষের সন্তুষ্টির বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের দেশের মানুষ ছোট ঘটনাতেই উত্তেজিত হয়ে যায়। ছোট ঘটনাকে বড় করে সাজিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করে। পুলিশকে চাপ দিতে থাকে তাদের ধরতে বা তাদের বিরুদ্ধে কঠিন কোনো ব্যবস্থা নিতে। এমনকি তাদের রিমান্ডে নেয়ার জন্যও উঠেপড়ে লেগে যায়। এরকম অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ যখন ব্যবস্থা নেয় তখন অভিযোগকারী খুশি হন। অপরদিকে যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়, তাদের পরিবার বা আত্মীয়-স্বজনরা বলে পুলিশ প্রচন্ড খারাপ। এই কারণে সব সময় পুলিশের বিরুদ্ধে একপক্ষের অভিযোগ থেকেই যায়। আইন মানার ক্ষেত্রে অসচেতনতাই এর অন্যতম কারণ। সকলকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে উভপক্ষই দাঁড়িয়ে থাকে এবং পুলিশের কাছে ঘটনার সঠিক বিবরণ দেয়। আর আমাদের দেশে দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যায় কিংবা অন্যকে দোষ দেয়। এর থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
সাধারণ মানুষ সেবার মান নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। তাদের ধারণা ঘুষ না দিলে পুলিশ কোনো কাজ করে না। এই ব্যাপারে আপনার অভিমত কি?- মানুষের কথাটা যে একেবারে অমূলক তা নয়। কিছু জায়গায় সমস্যা আছে। তবে কিছু কিছু মানুষ শুনে শুনে মিথ্যা গুঞ্জন ছড়িয়ে বেড়ায়। তবে ভুক্তভোগীদের উদ্দেশে বলবো যে, পুলিশের প্রত্যেক জায়গায় উর্দ্ধতন কর্মকর্তা আছে। যেখানে আপনি ভালো সেবা না পাবেন, সেখানকার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে আপনারা অভিযোগ করেন। আমি বিশ্বাস করি সেখান থেকে আপনারা ভালো সেবা পাবেন। তবে মিথ্যা গুঞ্জন ছড়ানোটা বন্ধ করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে বরাবরই আন্তরিক। ইতোমধ্যে পুলিশের ব্যাপক উন্নতি করেছেন। তাই পুলিশ এখন আগে থেকে অনেক বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে। পাশাপাশি পুলিশে এখন অনেক ভালো অফিসার আসছেন।
আপনার জীবনে কোনো অপূর্ণতা আছে কি?
ফরিদ উদ্দিন বলেন, ডাক্তার হতে পারিনি বলে আমার কোনো আপসোস বা অপূর্ণতা নেই। তবে একটি অপূর্ণতা আছে। তা হলো- বাবা অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছেন। চাকরি পাবার আগেই বাবা মারা যান। সেই কারণে বাবাকে চাকরির টাকা দিয়ে কিছু খাওয়াতে-পরাতে পারিনি। এটাই আমার সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা। সেটা কখনো পূরণ হবার নয়।
পুলিশে যারা চাকরি নিতে ইচ্ছুক কিংবা অধীনস্থদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কাজের স্বীকৃতি হচ্ছে নিজের মন। নিজের মন যদি বলে আমি ভালো আছি, মানুষকে সেবা দিতে পারছি। আমি যদি সন্ধ্যার পর তৃপ্তিটা নিয়ে ঘরে ফিরতে পারি, সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমার নিজের আত্মা যদি বলে আমি ভালো পথে আছি সেটাই বড় সন্তুষ্টি। পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে আমার একটি কথা, মানুষের উপকার করতে পারেন বা না পারেন, আপনার দ্বারা যেনো মানুষের ক্ষতি না হয়। আমি নিজে তা মেনে থাকি। জনগণের টাকায় আমাদের বেতন হয়। তাই সবাইকে সম্মান করতে হবে। তাদের কথা শুনতে হবে। পুলিশের পক্ষ থেকে যা করণীয় তা করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, আমরা ক্ষমতাবান না, আমরা দায়িত্বপ্রাপ্ত। আইন মেনে আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাহলেই মানুষ পুলিশকে ভালোবাসবে।
আরেকটি বিষয় আমি স্পষ্ট করে বলছি যে, মাদক থেকে দূরে থাকতে হবে। মাদকের ভয়াবহতা, বিশেষ করে ইয়াবা আমাদের সমাজে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এই আগুন বন্ধ করা না গেলে পরিবারসহ সবাইকে পুড়তে হবে। তাই ইয়াবা বা মাদকসেবীদের কখনোই আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ঘোলপাশা ইউনিয়নের ধনুসাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে এই পুলিশ অফিসারের জন্ম। তিনি বিবাহিত এবং তিন কন্যার জনক।